logo

শুক্রবার, ১৮ মার্চ ২০১৬ . ৪ চৈত্র ১৪২২ . ৮ জমাদিউল সানি ১৪৩৭

রফিক আজাদপ্রথম দেখা, শেষ দেখা
নির্মলেন্দু গুণ
১৮ মার্চ, ২০১৬
কবিবন্ধু সাযযাদ কাদির কবি রফিক আজাদের এই দুর্লভ ছবিটি পোস্ট করেছেন। ছবির ক্যাপশনে লেখা আছে ঐ ছবিটি যখন তোলা হয়েছিলো তখন রফিক আজাদ ১৯৬৪ সালে তৎকালীন ঢাকা হল (বর্তমানে শহীদুল্লাহ হল)-এ থাকতেন।

রফিক আজাদের এই ছবিটি আমার স্মৃতির দুয়ার খুলে দিলো।

ঠিক ঐ সময়েই আমি নেত্রকোনা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদে ভর্তি হতে এসে কবি রফিক আজাদের সংগে পরিচিত হয়েছিলাম তখনকার ঢাকা হলের একটি আড্ডামুখর কক্ষে। ঐ আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন রফিক আজাদ। অন্যদের মধ্যে ছিলেন প্রশান্ত ঘোষাল, শহীদুর রহমান ও মাহবুবুল আলম ঝিনু। ঝিনু তখন স্বাক্ষর পত্রিকায় মার্কিন বীট কবি লরেন্স ফার্লিংঘেট্টির টহফবৎধিৎব কবিতাটি অনুবাদ করে খুব নাম করেছিলেন।জন্ম টাংগাইলে হলেও রফিক আজাদের বেশ কিছুটা সময় কেটেছে নেত্রকোনায়। তার বড় ভাই সেখানে সরকারি চাকরি করতেন। রফিক আজাদ ঐ ভাইয়ের বাসায় থেকে নেত্রকোনা কলেজ থেকেই আইএ পাস করেন।নেত্রকোনা থেকে তখন উত্তর আকাশ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা  প্রকাশিত হতো। সম্পাদক ছিলেন সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী। ঐ পত্রিকায় রফিক আজাদ কবিতা লিখতেন। সেই উত্তর আকাশে  প্রকাশিত ‘জনৈক কেরানির রবিবার’ নামে তার একটি কবিতা তখন আমি প্রথম পড়ি। তখন শুনতাম রফিক আজাদের কবিতা ঢাকার পত্রিকাতেও ছাপা হয়। সমকাল কবিতা সংখ্যায় তার কবিতা ‘কারুকার্যময় হে দরোজা’ স্থান পেয়েছিল। সেইসূত্রে তার ছবি ছাপা হয়েছিল জনপ্রিয় ইত্তেফাক পত্রিকায়।উত্তর আকাশে আমার  প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৯৬১ সালে। ঐ কবিতায় (নতুন কা-ারী) নজরুল ও কবি রফিক আজাদের  প্রভাব ছিলো। মনে মনে রফিক আজাদের মতো কবি হওয়ার কথা ভাবতাম।ঢাকা হলে পরিচিত হওয়ার পর নেত্রকোনার প্রতি স্মৃতিকাতরতার কারণে তিনি আমাকে সময় ও সঙ্গ দিয়েছিলেন। এবং তাদের পিছু পিছু প্রেস ক্লাবের উল্টোদিকে অবস্থিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ইউসিস ভবনে যেতে দিয়েছিলেন।তাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল গুলিস্তানের রেক্স রেস্তোরাঁ। একজন নবাগত তরুণকে সেখানে নিয়ে যাবার নিয়ম ছিলো না। নামে চেনা কবি শহীদ কাদরী ছিনেন ঐ আড্ডার কন্ট্রোলার।

 সেই  প্রথম পরিচয়ের ৫২ বছর পর গত ১২ মার্চ অপরাহ্ণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়  প্রাঙ্গণে কবি ও মুক্তিযোদ্ধা রফিক আজাদের নিথর, শান্ত-শীতল কপাল স্পর্শ করলাম। তার নয়ন মুদিত। নাসারন্ধ্রে সাদা তুলো গোঁজা। গালে সামান্য খোঁচা দাড়ি।মুখে তার জীবনের শেষ সূর্যের কনেদেখা মøান আলো। আমাকে শেষবারের মতো তাকে একনজর দেখার সুযোগ দেবার পরই তার দুই পতœীর দুই পুত্র পিতার মরদেহ এম্বুলেন্সে তুলে নিয়ে এগিয়ে গেলো বারডেমের হিমঘরের দিকে।রফিক আজাদ দুই রাত ঐ হিমঘরে শুয়ে তার তৃতীয় পুত্রের জন্য অপেক্ষা করবেন।

কবিতার মানচিত্রের কারিগর

অলাত এহ্সান

বাংলা সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে- স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা অংশ গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তীতে দেশের সাহিত্যের অগ্রগতিতেও তারা ভূমিকা রেখেছেন। এও বলা যায়, স্বাধীনতা-পূর্ব সময়েই যারা সাহিত্যে উজ্জ্বল ছিলেন তাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন এবং যুদ্ধোত্তর সময়ে দেশ গঠনের মতো সাহিত্য গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। আবার এটাও ঠিক স্বাধীনতা-পূর্ব ও পরের দুই দশক বাংলা সাহিত্য, বিশেষত কবিতায় বাংলাদেশের কবিরা যে সিদ্ধি দেখিয়েছিলেন, তার তুলনা অন্য আর কোনো সময়ের সঙ্গে করা চলে না। সেই ষাটের দশক থেকে শুরু, পরবর্তী তিন দশক বাংলা কবিতার শক্তিমান কবিদের মধ্যে রফিক আজাদ অবিস্মরণীয়।

কবি রফিক আজাদকে স্মরণ করা যেমনি স্মৃতিময়, তেমনি তারুণ্যের। জীবনব্যাপী তিনি এতটাই তারুণ্যের বিস্ফোরক বয়েছেন যে, যুদ্ধ শেষে না তোলা স্থল-মাইনের মতো, কখনো কখনো স্বচকিত হয়ে তার কাব্যরা বিস্ফোরিত হয়েছে। যে কারণে তার কবিতা কখনো কখনো পুরনো নির্মাণ হলেও বিস্ফোরণটা আধুনিক সময়েও স্বশব্দ।

রফিক আজাদ তার জীবন ও সাহিত্য দেশ-কালের সঙ্গে এমনভাবে গেঁথে ছিলেন যে, দেশের ইতিহাসের সঙ্গে তার কবিতা সমান তালে পড়া যায়। কিংবা তার কবিতা থেকে দেশের ইতিহাস জানা যায়। যেমন- তার ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতার কথাই ধরা যাক।

 

‘দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অব্দি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে

অবশেষে যথাক্রমে খাবো : গাছপালা, নদী-নালা

গ্রাম-গঞ্জ, ফুটপাত, নর্দমার জলের প্রপাত

চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব^ প্রধান নারী

উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ি

আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ

ভাত দে হারামজাদা,

তা না হলে মানচিত্র খাবো’

 

এই সময় ও গণমানুষের ক্ষোভ ধারণ ও বহিঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে রফিক আজাদের এই কবিতা অনন্য। স্বাধীনতার মাত্র তিন বছর পর ক্ষমতা ও অর্থলিপ্সু একদল মানুষের অপরিণামদর্শী লুটপাটে দেশজুড়ে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে আসে তার প্রেক্ষাপটে এই কবিতা। এখনো যে কেনো সংকটে এই কবিতা সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়। এটা সেই সময় যখন কাব্যের লালিত্যে শব্দমালা নয়, এটা একইসঙ্গে সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ যার আহ্বানে দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তিনি তখন ক্ষমতায়। এমন এক সময় বিস্ফোরণের মতো কবিতাটি ক্ষমতার মসনদকে সরাসরি যেন চ্যালেঞ্জ করে। তার অবশ্য কারণও ছিল। যে পুঁজিবাদ-সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই পুঁজিবাদের মোড়লের কাছে ধরনা দেয়া ও সাম্প্রদায়িকতার ডিপোর ভেতরই হেঁদিয়ে পড়ছিল দেশ। ’৭৪ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকর্মী ও লেখিকা ওরিয়ান ফাল্লাচির নেয়া সাক্ষাৎকারের পরিপ্রেক্ষিতে তার জীবনের যে ঝুঁকি  তৈরি হয়েছিল, তা আজ কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

নিশ্চিত ঝুঁকি জেনেও একজন মুক্তিযোদ্ধা ও কবির তৎকালীন অবস্থা মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। তাই ‘ভাত দে হারামজাদা’ সেই সময় মানুষের ক্ষোভকে ভাষা দিয়েছিল। কবিতাটি সময়োপযোগীই শুধু নয়, বিশ্বব্যাপী বুভুক্ষু মানুষের পক্ষে এ এক বলিষ্ঠ উচ্চারণ। যার প্রয়োজনীয়তা আজো ফুরিয়ে যায়নি। পরবর্তীতে এই কবিতাটির সমসাময়িক একটি আফ্রিকান কবিতার সন্ধান পাই, যেখানে একইভাবে মানুষের ক্ষোভ মূর্ত করে তোলা হচ্ছে। সেখানে কবি বলছেনÑ

‘রুটি দে হারামজাদা

নইলে টাকা খাবে।’

অর্থাৎ রফিক আজাদের অমর কবিতাটি কোনো ব্যক্তি বা সরকারের বিরুদ্ধে যেমন, সর্ব গ্রাসী পুঁজিবাদের নিষ্ঠুর আচরণের বিরুদ্ধেও তেমনি। যে কারণে একই সংকটাবর্তে আফ্রিকার একটি কথার সঙ্গে রফিক আজাদের কবিতার লাইন অবলীলায় বিনিময় করা যায়।

একজন কবি যে একজন দার্শনিক- একথা প্রমাণিত। যে কারণে রফিক আজাদের ভেতরে দর্শন-রাজনীতি-মানবপ্রেম-প্রকৃতিপ্রেম নানাভাবেই এসেছে। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাও গভীর। যে রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘ভাত দে হারামজাদা’র মতো কবিতা লিখছেন, সামরিক অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে যখন তাকে উৎখাত করা হচ্ছে তিনি তারও প্রতিবাদ করছেন। কারণ, তিনি একটা গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাস চেয়েছিলেন। মানুষের ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে পরিবর্তনের নামে সামরিক জান্তার উত্থানকে তিনি কোনোভাবেই সমর্থন করেননি। যে কারণে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা- প্রশ্নে তার অবস্থান সুস্পষ্ট। তিনি বুঝেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তন আসছে তা দেশে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়ার দিকেই ধাবিত করবে।

 

‘এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে

         সিঁড়ি ভেঙে রক্ত নেমে গেছে

         বত্রিশ নম্বর থেকে

         সবুজ শস্যের মাঠ বেয়ে

 অমল রক্তের ধারা বয়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে।’

 

এখনো বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে বোধ করি শহীদ কাদরীর ‘হন্তারকের প্রতি’ কবিতার পরই রফিক আজাদের ওই কবিতাটি আবৃত্তি হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ক্ষয়িষ্ণু সমাজ ও সমাজের মানুষকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার দেখার ধরন যেমন স্বচ্ছ ও দেশাত্মবোধে উজ্জ্বল, তেমনি জীবনকে তাৎপর্যম-িত করে তুলতে অনিবার্যভাবে জীবন জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

 

‘মানুষ খুন করার মতো কোনো

যুক্তিগ্রাহ্য কারণ আমি দেখি না!’

 

এখানে মনে রাখা যায়, ষাটের দশকের কবিবন্ধু হুমায়ূন কবিরকে তার দলের লোকজন হত্যা করেছিল। রাজনৈতিক দর্শনে তিনি ছিলেন সাম্যবাদী দলের স্বক্রিয়কর্মী। তখন নকশালবাড়ি আন্দোলের তেজ আমাদের দেশেও আছড়ে পড়েছে। তখন সাম্যবাদী দলের শ্রেণিশত্রু খতমে লাইন, রক্ষীবাহিনী ও গণবাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতায় দেশে একটা খুনের ধারা গড়ে উঠছে। তখন তার ওই লাইন দুটি কবির অবস্থান প্রকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

 

‘আমার একটি আগ্নেয়াস্ত্র দরকার

আমার কোনো শত্রু নেই, আমার কোনো বন্ধু নেই

শত্রু-নিধন বা বন্ধুদের মুখ বন্ধ করার জন্য নয়,

কিংবা আত্মহত্যা করবার জন্যেও নয়-

 

বিশ্বাস করুন, এটি আমি কোনো লোকের বিরুদ্ধে

ব্যবহার করবো না :’ (আমার একটি আগ্নেয়াস্ত্র চাই)

 শ্রেণি-সচেতন, সমকালীন সমাজ আর জীবনের ঐকান্তিক অনুভবের ভেতরেও কবি শুনতে পান নাগরিক উল্লাস; অন্যদিকে স্মৃতিমগ্নতার গভীর অধ্যয়ন তার কবিতায় লক্ষণীয়। এখানে ‘নত হও, কুর্নিশ করো’ কবিতা স্মরণ করা যেতে পারেÑ

‘হে কলম, উদ্ধত হ’য়ো না, নত হও, নত হতে শেখো,

তোমার উদ্ধত আচরণে চেয়ে দ্যাখো, কী যে দুঃখ

পেয়েছেন ভদ্রমহোদয়গণ

 

হে কলম, এইবার নত হও, নতজানু হও,

শিখে নাও শিক্ষিত শিম্পাঞ্জিদের আচরণ-বিধি,

অতএব, নত হও, নত হ’তে শেখো, নতজানু হও।’

রফিক আজাদের কবিতার অন্যতম দিক হলো ভালবাসা ও সংগ্রাম যা পরিশুদ্ধতার মধ্য দিয়ে যায়। যে কারণে তার কবিতা নেহায়েত লাবণ্য ছড়ায় না, নিবিষ্টও করে। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’  গ্রন্থটি। এই  গ্রন্থের অধিকাংশ কবিতার বক্তব্য সুন্দর প্রকৃতি, নারী, মৃত্তিকা ও ফসলের তীব্র আকর্ষণ জীবনবৃত্তে আবর্তিত হয়েছে। প্রকৃতি ও নারীর প্রতি তার গভীর অনুভূতি নিগূঢ় বিন্যাসে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

 

‘রক্তপাত, সিংহাসন প্রভৃতি বিষয়ে

চুনিয়া ভীষণ অজ্ঞ;

চুনিয়া তো সর্বদাই মানুষের আবিষ্কৃত

মারণাস্ত্রগুলো

ভূমধ্যসাগরে ফেলে দিতে বলে।

চুনিয়া তো চায় মানুষের তিনভাগ জলে

রক্তমাখা হাত ধুয়ে তার দীক্ষা নিক।

চুনিয়া সর্বদা বলে পৃথিবীর কুরুক্ষেত্রগুলো

সুগন্ধি ফুলের চাষে ভ’রে তোলা হোক। (চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া)

কিংবা

‘নগর বিধ্বস্ত হ’লে, ভেঙ্গে গেলে শেষতম ঘড়ি

উলঙ্গ ও মৃতদের সুখে শুধু ঈর্ষা করা চলে।

‘জাহাজ, জাহাজ’- ব’লে আর্তনাদ সকলেই করি

তবুও জাহাজ কোনো ভাসবে না এই পচা জলে।’ (নগর ধ্বংসের আগে)

 

অথবা,

কবি লিখেনÑ

‘যদি ভালবাসা পাই আবার শুধরে নেব

জীবনের ভুলগুলো

যদি ভালবাসা পাই ব্যাপক দীর্ঘপথে

তুলে নেব ঝোলাঝুলি’ (যদি ভালবাসা পাই)

 

তার কবিতার মূল উপজীব্য মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও প্রেম। আধুনিক জীবনদর্শন, প্রথাগত ধ্যান-ধারণার এবং ব্যক্তিসত্তার মূল্য অধিক হওয়ার কারণে আত্মকেন্দ্রিক ও মুগ্ধতায় তিনিও হেঁটেছেন দীর্ঘপথ। তার সময়ের অন্য কবিদের থেকে তিনি আপন ধ্যান-ধারণা ও অস্তিত্ব নিয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এই সমাজ ও মানুষের কাছে। অনিবার্য হয়ে উঠেছে তার স্বপ্ন ও বাস্তবতা। সামাজিক সত্যের নিগূঢ় ঐতিহ্য তিনিও অস্বীকার করতে চাননি। নিজস্ব কাব্যকলার উৎস সন্ধানে তিনি নিসর্গ ও সমগ্র জীবনের সৌন্দর্য বারবার তীক্ষè বাস্তবতার অভিঘাতে আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করতে চেয়েছেন। তার কবিতায় উঠে এসেছে মানব চেতনার গূঢ় রহস্য।

 

‘এমন অনেক দিন গেছে

আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থেকেছি,

হেমন্তে পাতা-ঝরার শব্দ শুনবো ব’লে

নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছি বনভূমিতে-

কোনো বন্ধুর জন্যে

কিংবা অন্য অনেকের জন্যে

হয়তো বা ভবিষ্যতেও অপেক্ষা করবো’ (প্রতীক্ষা)।

 

রফিক আজাদের যাপিত জীবন তাকে কবিতে পরিণত করেছে। সম্প্রতি তার আত্মজীবনী ‘কোনো খেদ নেই’-এ সে কথাই জানিয়েছেন বহুবার। ’৫২ সালে তিনি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। সে সময় বাবা-মায়ের কঠিন শাসন অস্বীকার করে, ২২ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদদের স্মরণে মিছিলে খালি পায়ে অংশগ্রহণ করেন। ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৭১ সালে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সহকারী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ভাষা ও দেশের প্রতি এই ভালোবাসা পরবর্তী জীবনে তাকে তৈরি করেছিল একজন কবি হিসেবে। সতত মানুষ হিসেবে। এছাড়া গুণী  গ্রামের পাশেই ছিল মনিদহ  গ্রাম। সেখানের অধিকাংশই সুতার, ধোপা, দর্জি, চাষা ইত্যাদি। এই নিম্নশ্রেণি সম্প্রদায়ভুক্ত হিন্দু ছেলেমেয়েরাই ছিলেন রফিক আজাদের শৈশব-কৈশোরের বন্ধু। যে কারণে তার কবিতায় এইসব শ্রমজীবী নিম্নশ্রেণির মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা উছলে উঠেছে।

গুণী গ্রামের এই গুণী মানুষটির চিরপ্রস্থান বাংলা কাব্য-সাহিত্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। ভালোকে প্রচ- ভালোবাসার জন্য যেমন চাই, মন্দের প্রতি চাই তেমন প্রচ- ঘৃণাÑ রফিক আজাদের কবিতায় তা খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি কবিতায় যে মানুষ-প্রকৃতি-প্রেম-প্রজ্ঞা ও দ্রোহের পথ  দেখিয়েছেন, এ দেশের তরুণ তা থেকে যুগ যুগ দীক্ষা নেবে।

 

সর্বশেষ খবর

শঙ্খচিল এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by