logo

শুক্রবার, ১৮ মার্চ ২০১৬ . ৪ চৈত্র ১৪২২ . ৮ জমাদিউল সানি ১৪৩৭

সন্তপ্ত সংসারের কবি রফিক আজাদ
১৮ মার্চ, ২০১৬
কবি চলে গেলেন। এখন ফাল্গুনের রোদ ফুরিয়ে আসছে। পথে জনস্রোত। পথে উদভ্রান্ত গাড়ির হর্ন। পথে জীবনের কলরোল। দেখতে পাচ্ছি কবি চলে যাচ্ছেন। হয়তো কাঁধে ব্যাগ, হয়তো নেই। পরনে জিন্স প্যান্ট, ঝলমলে টি-শার্ট। ঘাড়ের কাছে লাফিয়ে নেমেছে ঝাঁকড়া চুল। বিকেলের রোদ ভেঙে চলে যাচ্ছেন কবি রফিক আজাদ। আর কোনদিন এই মলিন শহরে ফিরবেন না কবি।

অসুস্থ ছিলেন। মৃত্যুর ছায়া তার ওপর ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছিলো। কিন্তু রফিক ভাই সত্যি চলে যাবেন এমনটা কখনোই ভাবতে চায়নি মন। একজন কবির প্রস্থানে কি কোকিলেরা শোকসভা ডাকে? বৃক্ষ থেকে ক্রমাগত ঝরতে থাকে পত্রপুষ্প? কবির  প্রস্থানে কি ভূমি নিষ্ফলা হয়? হারিয়ে যায় ঘাসের সবুজ? এসবের কিছুই ঘটে না জানি। আজ দুপুর পর্যন্ত এই শহরের হাসপাতালে বেঁচে ছিলেন কবি রফিক আজাদ। আগামীকাল থেকে শুধুই স্মৃতি।

আমাদের এই বিমুখ প্রান্তরকে পুষ্পিত করে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি। শব্দে, ছন্দে, অনুভূতিতে বাংলা কবিতায় জাগিয়ে তুলেছেন এক আলাদা ভূখ-। সে ভূখ-ে জন্ম নিয়েছে সুঠাম বৃক্ষ, বুনো পাখির মতো শব্দ এসে ঘর বেঁধেছে সেই বৃক্ষের ডালে। এসেছে বসন্ত, চৈত্রের হাহাকার আর শীতের নিরাসক্তি।প্রায় তেত্রিশ বছর আগে প্রথম দেখা হয়েছিল তার সঙ্গে। সাপ্তাহিক রোববার অফিসের এক সফেন আড্ডায়। যতদূর মনে পড়ে সময়টা আজকের মতোই এক বিকেল ছিলো। নিজের অফিস কক্ষে বসেছিলেন রফিক ভাই। সামনে অনেক লেখক আর অনুরাগীদের ভিড়। সন্তর্পণে জায়গা করে নিয়েছিলাম সেই ভিড়ে। তারপর এই শহরের পথে, কবিতা পাঠের মঞ্চে, সাকুরার নিয়ন্ত্রিত আঁধারে, বই মেলায় দেখা হয়েছে রফিক ভাইয়ের সঙ্গে। আমরা কথা বলেছি, আড্ডা দিয়েছি। কখনো নিঃশব্দে বসে থেকেছি তার সামনের চেয়ারে। তিনি হয়তো তখন তাকিয়ে আছেন বাইরে। কাচের জানালা ভেদ করে তার দৃষ্টি চলে গেছে শেরাটন হোটেলের মোড়ে জমে থাকা গাড়ির দীর্ঘ লাইন পার হয়ে বহুদূরে। শেষবার তার সঙ্গে দেখা হলো গত বছর একটি দৈনিক পত্রিকার অনুষ্ঠানে। কুশল জানতে চাইলে তাকালেন মøান দৃষ্টি মেলে। শরীরে অসুখের গভীর ছায়া বিস্তারিত। সামান্য হেসে বললেন, আছি, এখনো এপারে আছি। কবির ঠোঁটে ফুটে উঠেছিল সামান্য হাসির রেখা। রফিক আজাদ ‘চলে যাবো সুতোর ওপারে’ কবিতায় লিখেছিলেন- ‘এখনো এপারে আছি, চলে যাবো সুতোর ওপারে। সুতোর ওপারে সুখ, সম্ভবত স্বাধীনতা আছে।’ কোথায় চলে যেতে চেয়েছিলেন কবি? আজ সত্যিই আমাদের সবাইকে ফেলে কোথায় খুঁজে নিতে গেলেন স্বাধীনতা? জানি, সব  প্রশ্নের উত্তর মেলে না। শুধু জানি, কবি চলে গেলে মনের ভেতরে গভীর বিষাদ জমে। মনে হয় পাখির ওড়ার কাল ফুরিয়েছে, ফুল ফুটে ওঠার  প্রহরও শেষ। শুধু তার অনুপস্থিতির বেদনা নিয়ে বয়ে চলেছে সময় তার আপন নিয়মে।কবির  প্রয়াণে লেখা হবে শোকবাণী। শোকসভায় অনর্গল কথা বলবেন বক্তারা। ব্যস্ত রিপোর্টারের আঙুল কম্পিউটারে গেঁথে তুলবে শব্দমালা।  প্রবল সংবাদ হবেন কবি রফিক আজাদ। কিন্তু আর কখনোই এই শহরে ফিরে আসবেন না। পেছনে তার কাব্যের সংসার ছড়িয়ে থাকবে। সেই আলাদা ভূখ-ে স্থির হয়ে থাকবে বসন্ত, চৈত্রের হাহাকার, শীতের নিরাসক্তি। স্থির হয়ে থাকবে অনুগত পাখির মতোন শব্দমালা। স্থির হয়ে থাকবেন প্রেমে, বেদনায় ধ্যানস্থ কবি রফিক আজাদ। আমাদের সন্তপ্ত সংসারের কবি।

সর্বশেষ খবর

শঙ্খচিল এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by