logo

শুক্রবার, ১১ মার্চ ২০১৬ . ২৮ ফাল্গুন ১৪২২ . ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৭

ছদ্মনাম
১১ মার্চ, ২০১৬
সোহরাব শান্ত
সাধারণ মানুষের চেয়ে কবি-লেখকদের নাম হতে হয় কিছুটা ব্যতিক্রম। এই ধারণা থেকেই নিজের একটি ছদ্মনাম ঠিক করলেন খাইরুল সাহেব। ‘সায়র সুজন’ ছদ্মনামে এবারের বইমেলায় তার বই প্রকাশ হয়েছে। প্রথমবারই একসঙ্গে তিনটা বই। কবিতার বইয়ের নাম ‘ফুলের সৌন্দর্য ও পাপড়ি ছেঁড়ার কষ্ট’, গল্পের বই ‘আধডুবা হিজল’ এবং উপন্যাস ‘চাইলে তুমি কিনতে পারো মন বাগানের ফুল’।সায়র সুজন নামটা ঠিক করার আগে প্রকাশক তাহের সিরাজীর সাথে পরামর্শ করে নিয়েছেন খাইরুল সাহেব।    সিরাজী সাব।    জ্বি স্যার।আপনি তো বলেছিলেন আমার একটা ব্যতিক্রমী ছদ্মনাম দেবেন। ভাবলেন কিছু?জ্বি স্যার, আমি তো এই ভাবনার মধ্যেই আছি। গতরাতে এক লেখকের পা-ুলিপি পড়তে বসেছিলাম। মন দিতে পারি নাই। মনের মধ্যে শুধু আপনার ছদ্মনামটা নিয়া ভাবনা উঁকিঝুঁঁকি মারে। স্যার, ‘মন ফড়িং’ নামটা কেমন!

খাইরুল সাহেবের চেহারাই বলে দিচ্ছে ‘মন ফড়িং’ নামটা তার পছন্দ হয়নি। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। বিশাল ব্যাপার। ছদ্মনাম তার চাই ঠিক আছে। তাই বলে সামান্য ফড়িংয়ের আশ্রয় নিতে হবে?কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন, সিরাজী সাব আপনাকে একটু সহজ করে দেই। ছোটবেলায় গ্রামের লোকজন আমাকে সুজন ডাকতো। সমবয়সীদের কেউ কেউ এখনো এই নামে ডাকে। আপনি ভাল একটা নামের সাথে সুজন যোগ করে ছদ্মনামটা বানিয়ে নিতে পারেন।  খাইরুল তালুকদার যুগ্মসচিব। শখের লেখক। শেষ বয়সে এসে বই প্রকাশের ইচ্ছা জেগেছে। তার একমাত্র ছেলে দেশের বাইরে থাকে। দেশে ফিরবে বলে মনে হচ্ছে না। স্ত্রী চাকরিসূত্রে থাকেন ঢাকার বাইরে। ঢাকায় পরিবারের লোকজন ছাড়া খাইরুল সাহেবের সময় কাটতেই চায় না। বই বের করলে লেখালেখিতে আরো মন বসবে। সময়টা ভাল কাটতে পারে। বন্ধুমহলে আলাদা একটা ইমেজ  তৈরি করা যাবে। এসব চিন্তা থেকেই প্রচুর টাকা খরচ করে বই প্রকাশে হাত দিয়েছেন তিনি। বই প্রকাশের প্রস্তাবটা পেয়ে এক লাফে তা লুফে নিয়েছেন ‘ছেঁড়া কাগজ’ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী তাহের সিরাজী। খাইরুল সাহেবের সাথে কথা বলার সময় সরকারি কর্মচারীদের মতো ঘন ঘন স্যার স্যার করেন তিনি। বই প্রকাশের সব খরচ খাইরুল সাহেবই দিচ্ছেন। খরচের টাকা দিয়েছেন প্রকাশকের চাহিদা অনুযায়ী।

তাহের সিরাজী হিসাব করে দেখেছেন, তিনটা বই প্রকাশ করে নগদে হাজার পঞ্চাশেক টাকা মুনাফা হবে তার। মেলায় এক কপি বিক্রি না হলেও কোনো চিন্তা নাই। বিক্রি হলে তো কথাই নাই। সব যোগ হবে মুনাফার খাতায়। খাইরুল সাহেব আগেই বলে দিয়েছেন, বই বিক্রির টাকা তিনি নেবেন না।

সব মিলিয়ে খাইরুল সাহেবের ব্যাপারে তাহের সিরাজী ব্যাপক আগ্রহী। বছরে এমন কিছু শখের লেখক আসে বলেই তো তার প্রকাশনী মোটা অংকের লাভ করতে পারছে। বই ছাপার জন্য বাড়তি লগ্নির দরকার নাই। উল্টো খরচের চেয়ে অনেক বেশি টাকা আদায় করা যায়। সমস্যা হলো প্রকৃত লেখকদের নিয়ে। তাদের বইয়ের পা-ুলিপি আনতে হয় অগ্রিম টাকা দিয়ে।    তাহের সিরাজীর ভাবাভাবি শেষ। বিরাট ভাব নিয়ে তিনি খাইরুল সাহেবের সামনে দাঁড়ালেন তিনি। স্যার, আপনার নাম ঠিক করে ফেলেছি।তাই নাকি? কী নাম ঠিক করলেন! স্যার, আপনার হৃদয়টা তো সাগরের মতো বিশাল...

আপনি কি সাগর সুজন ভাবছেন? এ বয়সে আমি সাগর নামে পরিচিত হবো? এসব তো ছেলে-ছোকরাদের নাম।

না, না, স্যার। আমি বাস্তবতাটা বললাম শুধু। আপনার হৃদয় তো সত্যিই সাগরের মতো বিশাল।

তা, নামটা কি ঠিক করলেন বলুন।স্যার, আপনার নাম ঠিক সাগর নয়। তবে অর্থটা ওই সাগরই। সাগরের আরেক প্রতিশব্দ, সায়র।

সায়র সুজন! ব্যতিক্রমী। চলতে পারে। মুচকি হাসেন খাইরুল তালুকদার।নামটা ব্যাপকভাবে পাঠককে টানবে স্যার। কবিতার বইয়ের নামটাও জটিল।জটিল মানে?সুন্দর স্যার। সুন্দর।তাই বলুন! উপন্যাস আর গল্পের বইয়ের নামগুলো পছন্দ হলো না বুঝি?তাও পছন্দ হয়েছে স্যার। আসলে কবিতার বইটার নামের সাথে ‘ছেঁড়া’ শব্দটা আছে কিনা! আমার প্রকাশনীর নামের সঙ্গে মিল আছে।

মেলার প্রথম দিনেই সায়র সুজনের কবিতার বই ‘ফুলের সৌন্দর্য ও পাপড়ি ছেঁড়ার কষ্ট’ প্রকাশ হলো। প্রকাশক তাহের সিরাজীর পরামর্শেই মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান করেননি সায়র সুজন তথা খাইরুল তালুকদার। ইচ্ছা ছিল অনেক টাকা খরচ করে স্মরণকালের সবচেয়ে সুন্দর আয়োজনে বই তিনটির মোড়ক উন্মোচন করবেন তিনি।প্রকাশক বললেন, স্যার আপনার ছদ্মনামটা নিয়ে পাঠকের আগ্রহটা যাচাই করে নেন। তিনটা বই একসঙ্গে মেলায় আনছি না। প্রথম দিন কবিতারটা। চার-পাঁচদিন যাওয়ার পর বাকি দুইটা বই প্রকাশ করবো। তখন চাইলে মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান করতে পারবেন।

প্রকাশকের প্রস্তাব মেনে নিলেন সায়র সুজন তথা খাইরুল সাহেব।প্রথম দিনের মেলায় সায়র সুজনের কবিতার বই বিক্রি হলো মাত্র এক কপি। একটা কম বয়সী মেয়ে ‘ছেঁড়া কাগজ’ প্রকাশনীর স্টলের সামনে এসেই বইটা হাতে নিলো। সম্ভবত বইয়ের নামের সাথে কবির নামটিও তাকে চমক দিতে পেরেছে। কিশোরীটি বইটি উল্টেপাল্টে ফ্ল্যাপ দেখতে শুরু করলো। এরপর এককপি বই কিনে অন্য স্টলের দিকে হাঁটা দিল।

বইয়ের ফ্ল্যাপে সায়র সুজনের তরুণ বয়সের একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। লেখক সম্পর্কে কাব্যিক কিছু কথা লেখা হলেও যুগ্মসচিব পরিচয়টি প্রকাশ করা হয়নি। এ কাজটিও করা হয়েছে প্রকাশকের পরামর্শে।সন্ধ্যার দিকে এক টিভি সাংবাদিক সাক্ষাৎকার নেয়ার সময় হাসতে হাসতে প্রশ্ন করলো- স্যার, আপনার বইয়ের ফ্ল্যাপে দেখলাম তরুণ বয়সের ছবি। এর কারণ কি?খাইরুল সাহেবও হাসতে হাসতে বললেন, কবিরা সবসময়ই তরুণ। তাছাড়া তরুণ বয়স থেকেই আমি লিখি। কিন্তু ঘটনাক্রমে বই বের করলাম এই বয়সে এসে। তাই তরুণ কবিকেই বইয়ের ফ্ল্যাপে ধরে রাখলাম।টিভি সাংবাদিক যখন প্রশ্ন করলেন, ‘আজ আপনার কয় কপি বই বিক্রি হলো’? খাইরুল সাহেব জবাব দেয়ার আগেই প্রকাশক পাশ থেকে বলে উঠলেন, ‘আজ স্যারের বইটি তের কপি বিক্রি হয়েছে’!শুভকামনা জানিয়ে টিভি রিপোর্টার বিদায় নিলেন।বিস্ময় ও রাগ নিয়ে প্রকাশের কাছে এই মিথ্যা কথার কারণ জানতে চাইলেন খাইরুল তালুকদার।স্যার, এসব প্রচারণার কৌশল। প্রথম দিনেই আপনার কবিতার বই তের কপি বিক্রি হয়েছে- এ খবর জানার পর লোকজন আগ্রহ নিয়ে বইটি কিনতে আসবে। তাই বলে মিথ্যা বলে প্রচার করতে হবে?স্যার, এটাকে মিথ্যা বলছেন কেন। এটা তো প্রচারণার কৌশল শুধু তাই না? বইটা যে তিনশো কপি ছাপা হয়েছে এটাও বলবেন না কাউকে। বলবেন, পাঁচশো কপি ছাপা হয়েছে।খাইরুল সাহেব কী বলবেন ভেবে পেলেন না। চুপ হয়ে গেলেন।মেলার প্রথম সপ্তাহেই খাইরুল সাহেবের গল্পের বই ও উপন্যাসটা স্টলে তুললো প্রকাশক। আশ্চর্য। মোড়ক উন্মোচনের কোনো আগ্রহই দেখালেন না খাইরুল সাহেব। কবিতার বইটি ভাল না চললেও গল্প আর উপন্যাসের বিক্রি ভাল। প্রতিদিনই কয়েক কপি বিক্রি হচ্ছে। কেউ কেউ অটোগ্রাফ নিচ্ছে। বইমেলার শেষদিন এক তরুণীকে অটোগ্রাফ দিতে দিতে খাইরুল সাহেবের মনে হলো তিনি আসলেই সায়র সুজন নামের মানুষ। খাইরুল তালুকদার নামের কাউকে তিনি চেনেন না! তিনি জীবনে কখনো সচিবালয়ে চাকরি করেননি। সায়র সুজন ছদ্মনামের সাথে সাথে তিনি নিজেই যেন এক বদলে যাওয়া মানুষ। তার ঠিকানা এই মেলাপ্রাঙ্গণ। আফসোস, মেলা আজ শেষ হয়ে যাচ্ছে!

সর্বশেষ খবর

শঙ্খচিল এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by