logo

শুক্রবার, ৪ মার্চ ২০১৬ . ২১ ফাল্গুন ১৪২২ . ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৭

বালি হাঁসের ডাক
০৪ মার্চ, ২০১৬
স্বকৃত নোমান
পানাই নদীর জলকু-ের ভেতর স্রোতে ভেসে আসা খড়কুটোরা যেভাবে সাঁই করে ঢুকে পড়ে, ঠিক সেভাবে  জ্যৈষ্ঠের দিনগুলো ফুরাতে ফুরাতে মাসটা যখন মহাকালের মহাকু-ে ঢুকে পড়ার জন্য ধেয়ে চলে, ঠিক সেই সময়টায় উত্তর দিক থেকে একটু একটু করে জল আসতে আসতে মধ্যশ্রাবণে হাওরটা টইটম্বুর হয়ে ওঠে। তখন তো হাওরের কূলকিনারা থাকে না। যেদিকে তাকাও জল আর জল, ঢেউ আর ঢেউ। তবু ভকশিমইলের উত্তরে দাঁড়িয়ে বাঁ-হাতের তালুটা তেরচা করে কপালে ঠেকিয়ে দক্ষিণে তাকালে দিগন্তজোড়া হাওরের পাড়ে ঝকঝকে টিনের যে ঘরটি দেখা যাবে সেটি সুজনচন্দ্র দাশের।

মায়ের সঙ্গে বউয়ের বনিবনা না হওয়ায় বাড়ির পুবের ভিটায় সুজন মাত্র পনের দিনে ঘরটি তুলে বউ-বাচ্চা নিয়ে উঠে পড়ে। বাইরে থেকে ঘরটি সুন্দর দেখালেও ভেতরে সুন্দর লাগার মতো তেমন কিছু নেই। সামনের কামরায় একটা খাট, কাঠের একটা আলমিরা আর কয়েকটা চেয়ার। কোনায় একটা টেবিলে একটা কম্পিউটার, আর ভেতরের ঘরে একটা দোলনা আট বছর ধরে ঝুলছে। সারা ঘরে আসবাব বলতে এই। সুস্মিতার সঙ্গে সংসার পেতেছে প্রায় দশ বছর হতে চলল, তবু সংসারটা এখনো ঠিক সাজিয়ে তুলতে পারেনি। পারবে কীভাবে, কলেজের একজন প্রভাষকের ক’টাকা বেতন? খেতে-পরতেই তো সব খরচ হয়ে যায়। ঘরের পেছনেও তো কম টাকা যায়নি, সেই ঋণ এখনো পুরোপুরি শোধ দিতে পারেনি। তা ছাড়া যতই মান-অভিমান থাকুক, মাকে তো আর মা বলে অস্বীকার করতে পারে না সুজন। মা তার একটু জটিল চরিত্রের বটে, অন্যের ভালো মোটেই সইতে পারে না। ছেলেবউ তো বটেই, পাড়াপড়শিদের সঙ্গেও সবসময় ঝগড়া-ফ্যাসাদ বাধিয়ে রাখে। বিশ শতকের নারী, চরিত্র তার এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। পৃথিবীটা যে আর হাকালুকি হাওরের মতো অপরিবর্তিত হালে নেই সেকথা তো তার অজানা। জানতে হয়তো পারত, ঘরে যদি একটা টেলিভিশন থাকত। মানুষের আদিম জটিল সংস্কৃতিকেও বদলে দেয় টেলিভিশন।

আলাদা হয়ে যাওয়ার পরও মা এখনো সময়-অসময়ে ছেলেবউকে গালাগালি করে, সুজন শুনতে পায়। কিন্তু কিছু বলে না, উল্টো বউকে মুখে তালা লাগিয়ে রাখতে বলে। সে শিক্ষিত ছেলে, তার বউটাও ইন্টারমিডিয়েট পাস, মায়ের যত দোষই থাকুক, ছেলে হয়ে তার সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করলে লোকে তাকে ভালো বলবে না। বাপটা চিতায় চড়ার সময় মায়ের জন্য বাড়িটা আর তিন ছেলে আর দুই মেয়ে ছাড়া স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ কিছু রেখে যায়নি। আলাদা হয়ে গেলেও মা-ভাইয়ের ভরণ-পোষণের ভার নিজের কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখতে পারেনি সুজন। সৌভাগ্য যে, বোন দুটির বিয়ে হয়ে যায় বাপ বেঁচে থাকতেই এবং বছরখানেক আগে তার ছোট এক ভাই সিলেটের কোন লন্ডন প্রবাসীকে ধরে কীভাবে যেন লন্ডন চলে গেছে। গত কয়েক মাস ধরে সে অল্প অল্প টাকা পাঠাচ্ছে। এবার যদি সুজনের কাঁধ থেকে বাপের সংসারের জোয়ালটা নামে!

এত কিছুর পরও হয়তো নিজের সংসারটা সুজন সাজিয়ে তুলতে পারত, যদি না বালক কৃষ্ণের মতো সুন্দর তার ফুটফুটে ছেলেটা আজন্মের বোবা হতো। শরীরের কোথাও কোনো খুঁত নেই, একেবারে ঠিক মায়ের মতো, অথচ ভগবানের কী লীলা, আট বছর বয়স হয়ে গেল নিশানের, এখনো পর্যন্ত একটিবার বাবাকে বাবা আর মাকে মা বলে ডাকল না!

সুস্মিতাকে পাওয়ার জন্য জীবনের সবকিছু এমনকি জীবনটাকেও তুচ্ছজ্ঞান করেছিল সুজন। স্বপ্ন দেখেছিল বিয়ের পর দুজনের সংসার হবে অনাবিল হাসি-আনন্দে ভরপুর একটা সুখী সংসার। অথচ ভগবান কিনা তার ভাগ্য নিয়ে নিষ্ঠুর খেলা খেলতে শুরু করলেন! বিয়ের পর থেকে মা তাকে একটা দিনও শান্তিতে থাকতে দিলো না। সইতে না পেরে ঘরের কাজ শেষ হওয়ার আগেই সাত মাসের নিশানকে নিয়ে নতুন ঘরে চলে এল। যাক, এবার বুঝি শান্তি ফিরবে! নিশান আর সুস্মিতাকে নিয়ে এবার বুঝি গড়ে তুলতে পারবে নিজের একটা জগৎ।

এক বছর গেল, দু-বছর গেল, তৃতীয় বছরটাও কেটে গেল, অথচ নিশানের মুখে ভাষা ফুটল না। সুজন চোখে অন্ধকার দেখে। হায়! এ তার কেমন ভাগ্য! জুড়ি থেকে কুলাউড়া, সিলেট থেকে ঢাকা?  কোথায় কোন ডাক্তারের কাছে নেয়নি ছেলেকে? সব ডাক্তারেরই একই কথা, না, জীবনে কোনোদিন নিশানের মুখে কথা ফুটবে না।

তবু সুজন হাল ছাড়ে না, পাঁচ-ছ মাস পর পরই সে নতুন নতুন ডাক্তারের কাছে ছেলেকে নিয়ে হাজির হয়। ডাক্তারের পিছে টাকা ঢালতে ঢালতে সংসারের  দৈন্যদশা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। পা ঢাকলে মাথা উদোম, মাথা ঢাকলে পা উদোমের মতো অবস্থা।

সংসারের এই  দৈন্যদশার জন্য বিন্দুমাত্র দুঃখবোধ নেই সুজনের, বেঁচে থাকলে একদিন সংসার সে ঠিকঠাকমতো গুছিয়ে তুলতে পারবে, দুঃখ তার ছেলেকে নিয়ে। ছেলের দুঃখে সে হাসতে পর্যন্ত ভুলে গেছে। তবু সে পুরুষ, মনের দুঃখ-কষ্ট করে হলেও চাপা দিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু সুস্মিতা তো মা। মায়ের মন চিরকালই হাকালুকির পাঁক-কাদার মতো নরম। মায়েরা ইচ্ছে করলেই বাবাদের মতো মনের মণ মণ ওজনের বেদনাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারে না। রাখতে গেলে বুকটা ফেটে যেতে চায়।

এত দুঃখের মধ্যেও সুখের ব্যাপার, কথা নিশান বলতে না পারলেও শুনতে কোনো অসুবিধা হয় না তার। গভীর রাতে বাবা-মায়ে ফিসফিসিয়ে কথা বললেও সে জেগে থাকলে মাথাটা ঘুরিয়ে চোখ পিটপিট করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। পাড়ার ছেলেছোকড়াদের সঙ্গে বাড়ির বাইরে খেলতে গেলে মা যখন ‘নিশান নিশান’ বলে ডাক দেয়, নিশান কোনোদিন ছুটে আসতে ভুল করেনি। ছুটির দিনে বাবা বাড়িতে থাকলে কম্পিউটারে রবীন্দ্রনাথের গান বাজানোর সময় সে যেখানেই থাকুক, ছুটে এসে টেবিলটার নিচে পা দুটো মুড়ে বসে যাবে। গানের তালে তালে হেলবে, দুলবে, মাথাটা এদিক-ওদিক নাড়াবে, মাঝেমধ্যে দু-হাতে তালিও বাজাবে। সুমন চট্টোপাধ্যায়ের সমধুর কণ্ঠে ‘পাখির কণ্ঠে আপনি জাগাও আনন্দ/ তুমি ফুলের বক্ষে ভরিয়া দাও বসন্ত’? রবীন্দ্রসঙ্গীতের এই চরণগুলো যখন বাজতে থাকে তখন তার আর নড়ন-চড়ন থাকে না, গভীর এক নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করে ফেলে। কে জানে তখন কী হয় তার, গানটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাথাটা ঝুঁকিয়ে ঠায় বসেই থাকে। গানটা শেষ হলে দু-হাত বাড়িয়ে মুখটা হাঁ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে কী যেন বলতে চায়, কিন্তু পারে না।

সন্তানের মতো মায়ের বাকও তখন রুদ্ধ হয়ে পড়ে। দু-হাতে ছেলেকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে চুপ করে বসে থাকে। না পারে কাঁদতে, না পারে হাসতে, না পারে কোনো কথা বলতে।

দীর্ঘক্ষণ ছেলেকে বুকে জড়িয়ে রাখার পর একটা সময় নিশান বালিহাঁসের ডাক শুনে মায়ের কোল ছেড়ে হাওরের কূলে ছুটে গেলে সুস্মিতার বুকটা তখন ফেটে যেতে চায়। সে আর কান্না রুখতে পারে না, সদ্যজন্মা শিশুর মতো হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। কান্নার শব্দ পাছে শাশুড়ি শুনতে পেলে তো বলবে, ‘হাতে ধরে শাশুড়ির অভিশাপ নিছ, এখন ইচ্ছেমতো কান্দো’, তাই সে মুখটা এক হাতে চেপে ধরে শুধু ফোঁপায়। এই ফোঁপানি আর থামে না। ফোঁপানি থামলেও অশ্রু থামতে চায় না। চোখ দুটি যেন কুশিয়ারার দুটি শাখা। নিরবধিকাল জল বয়েই যাচ্ছে, বয়েই যাচ্ছে।

নিশান সেই যে যায় আর ফেরার খবর থাকে না। হাওরের তীরে তীরে, ক্ষেতের আলে আলে, রাস্তার ধারে ধারে ছেলেপিলেদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। শামুক কুড়ায়, ঝিনুক কুড়ায়। কখনোবা দু-একটা টেংরা, পুঁটি, গুঁজিআইড় ধরে রান্নাঘরে রান্নাবাড়ায় ব্যস্ত মায়ের হাতে ধরিয়ে দেয়। কণ্ঠে উঁ উঁ শব্দ তুলে হাতের ইশারায় মাকে বোঝাতে চায়, ‘মা, মাছগুলো রাঁধো, আমি খাব।’ কখনোবা একটা জ্যান্ত কাঁকড়া ধরে উঠোনে এনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওটার পিছে লেগে থাকে। তার হাঁটাচলা দেখে। কাঁকড়া তার ঠ্যাংটাকে বাঁকা করলে নিশানও তার ঠ্যাংটা বাঁকা করে। কাঁকড়া হাঁটতে শুরু করলে নিশানও তার পাশেপাশে হামাগুড়ি দিতে থাকে। স্থল ও জলচর ভাষাহীন দুই প্রাণীর খেলা চলতে থাকে। 

নিশানের বয়স যেদিন আট বছর পূর্ণ হলো, তার দু’দিন পর থেকে শ্রাবণের ঘোর বর্ষা শুরু হলো। হাকালুকি হাওর তার সীমানার বিস্তার ঘটাতে ঘটাতে ঘরের দাওয়া পর্যন্ত ঠেকল। জল আর জল, জলের সঙ্গে কচুরিপানার দঙ্গল। বন্যায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সুজনের কলেজ কর্তৃপক্ষ আপদকালীন ছুটি ঘোষণা করেছে।

সেদিন দুপুরে ঘরের দরজার সামনে একটা চেয়ারে নিশানকে কোলে নিয়ে বসা সুজন, আরেকটি চেয়ারে বসে দেড় বছরের মেয়েটাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিল সুস্মিতা। বন্যার জলে ভাসতে ভাসতে একটা বালিহাঁস উঠানে এসে ডাকতে শুরু করল। নিশান ডান হাতটাকে যতটা পারে লম্বা করে হাঁসটার দিকে বাড়িয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘মা মা, বালিহাঁস বালিহঁাঁস।’

সর্বশেষ খবর

শঙ্খচিল এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by