logo

শুক্রবার, ৪ মার্চ ২০১৬ . ২১ ফাল্গুন ১৪২২ . ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৭

উত্তাল মার্চ
মার্চ ১৯৭১ : স্মরণের সাঁকো
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলনে ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ ১৯৭১, সারা পূর্ব পাকিস্তান অস্বীকার করে সামরিক শাসনকে। বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনায় চলতে থাকে বাংলাদেশ। তাজউদ্দীন আহমদের সুনিপুণ দক্ষতায় ও সাংগঠনিক পরিচালনায় সারা পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে জনগণ শুরু করে বাংলাদেশের শাসন। তখনো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়নি। অথচ পাকিস্তানে কায়েম হয়েছে বাঙালির শাসন। বাঙালির কথায় অফিস, আদালত, যানবাহন, ব্যাংক, বীমা চলেছে। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলনের চেহারা ছিল মূলত অহিংস। আঘাত না আসা পর্যন্ত পাল্টা আঘাত হানেনি বাঙালি
০৪ মার্চ, ২০১৬
শুভ কিবরিয়া
মার্চ ১৯৭১ ছিল বাঙালির জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বলতম সময়। মার্চ ’৭১-এর  প্রথম তিন সপ্তাহ এক ত্রিমাত্রিক অসহযোগ আন্দোলন বাঙালি জাতিকে নিয়ে গিয়েছিল অসীম উচ্চতায়। বাঙালির অসহযোগ আন্দোলন ছাড়িয়ে গিয়েছিল গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের মাত্রাকে। ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ ১৯৭১ সন্ধ্যা পর্যন্ত বাঙালি সরকার ছাড়াই রাজ্যশাসন করেছে অসীম নির্ভীকতায়। ১৯৭০-এর নির্বাচনে জেতা আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দেয়নি ইয়াহিয়ার পাকিস্তানি সামরিক সরকার। ভুট্টোর কূটকৌশলে ইয়াহিয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকেও বার বার তা স্থগিত করেছে। ইয়াহিয়ার এই ছলচাতুরির জবাব ছিল ছাত্র-জনতার অসহযোগ।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলনে ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ ১৯৭১, সারা পূর্ব পাকিস্তান অস্বীকার করে সামরিক শাসনকে। বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনায় চলতে থাকে বাংলাদেশ। তাজউদ্দীন আহমদের সুনিপুণ দক্ষতায় ও সাংগঠনিক পরিচালনায় সারা পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে জনগণ শুরু করে ‘বাংলাদেশের’ শাসন।

তখনো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়নি। অথচ পাকিস্তানে কায়েম হয়েছে বাঙালির শাসন। বাঙালির কথায় অফিস, আদালত, যানবাহন, ব্যাংক, বীমা চলেছে। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলনের চেহারা ছিল মূলত অহিংস। আঘাত না আসা পর্যন্ত পাল্টা আঘাত হানেনি বাঙালি।

৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী বক্তৃতার পর মার্চজুড়েই গোটা পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলনের যে জোয়ার দেখা দিয়েছিল, তা ইতিহাসে শুধু অনন্য ঘটনাই নয়, এক অবিস্মরণীয় ঘটনাই বটে।

বাঙালির ইতিহাস কালপর্বের এই স্বেচ্ছাব্রতী রাজনৈতিক আন্দোলনের পথ ধরেই আসে মুক্তিযুদ্ধ। তারপর জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।  

২.

১৯৭১-এর মার্চ পর্বের এই অসহযোগের চেহারা কেমন ছিল, কর্মসূচি ও ঘটনাপঞ্জির স্মরণ সাঁকোয় চড়ে দেখা যেতে পারে তা-

১ মার্চ ১৯৭১

পূর্ব পাকিস্তানের সময় বেলা ১টা ৫ মিনিটে পাকিস্তান বেতারে পঠিত এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলেন, ‘দেশের বর্তমান মারাত্মক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই তিনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন।’

 বেলা সাড়ে ৪টায় পূর্বাণী হোটেলে আহূত এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সকল উপায় ব্যর্থ হয়েছে। সংখ্যালঘু দলের মনোভাবের জন্য অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। আমরা একে চ্যালেঞ্জবিহীন ছেড়ে দিতে পারি না। যারা মনে করেন আমরা বসে থাকব, তারা বোকার বেহেশতে বাস করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আওয়ামী লীগ আমাকে দান করেছে।’

২ মার্চ ১৯৭১

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষের নির্বাচিত  প্রতিনিধিরা শাসনতন্ত্র রচনার  প্রশ্নে ৩ মার্চ পশ্চিম অংশের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে  প্রস্তুত আছি। পশ্চিম অংশের কিছু  প্রতিনিধি ইতোমধ্যে ঢাকায় পৌঁছেছেন। কিন্তু এরই মধ্যে আকস্মিকভাবে পরিষদের অধিবেশন বন্ধ করে দেয়া হলো। পশ্চিম অংশের কায়েমি স্বার্থবাদী গ্রুপের স্বার্থেই এটা করা হয়েছে। ওদের তল্পিবাহী আমলারা ঘোষণা করেছে যে, তাদের নির্দেশিত শর্তে রাজি না হলে পরিষদের অধিবেশন বসবে না। এমন কি পশ্চিমাংশের যেসব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তাদের নির্দেশ বা হুকুম লঙ্ঘন করে ঢাকায় এসেছেন, ওরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণেরও হুমকি দিয়েছে। বাংলার মানুষ এ ধরনের অবাঞ্ছিত চাপকে কিছুতেই মেনে নেবে না।’

তিনি নিম্নের কর্মসূচিসমূহ ঘোষণা করেন :

কর্মসূচি-১ : ‘৩ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত  প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল পালন করা হবে। এই হরতাল সকল স্তর, যেমন- সরকারি অফিস-আদালত, সেক্রেটারিয়েট, হাইকোর্ট ও অন্যান্য আদালত, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, পিআইএ, রেলওয়ে ও অন্যান্য যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা, মিল-ফ্যাক্টরি, সওদাগরি অফিস, হাট-বাজার সকল স্থানে পালনের আহ্বান করছি।’

কর্মসূচি-২ : ‘৩ মার্চ জাতীয় শোক দিবস পালন করা হবে। এই দিনে পল্টন ময়দান থেকে বিকেল চারটায় আমি একটি মিছিলের নেতৃত্ব দেব।’

কর্মসূচি-৩ : ‘রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্র  প্রতিষ্ঠান যদি আমাদের সংবাদ ঠিকমতো পরিবেশন না করে তবে এসব  প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল বাঙালি কর্মচারীর উচিত হবে তাদের কাজে সহযোগিতা না করা।’

কর্মসূচি-৪ : ‘৭ মার্চ দুপুর ২টায় রেসকোর্স ময়দানে (শহীদ সোহরাওয়ার্দী ময়দান) আমি গণসমাবেশে ভাষণ দেব এবং পরবর্তী কার্যক্রমের নির্দেশ  প্রদান করব।’

৬ মার্চ ১৯৭১

 প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গতকাল দুপুর ১.৫ মিনিটে দেশবাসীর  প্রতি  প্রদত্ত ভাষণে ঘোষণা করেন যে, আগামী ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। প্রসঙ্গত প্রেসিডেন্ট বলেন যে, পার্লামেন্টের বিভিন্ন দলের নেতাদের মধ্যে বৃহত্তর সমঝোতার আশায় তিনি ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত অধিবেশন স্থগিত রেখেছিলেন কিন্তু তা সফল না হওয়ায় এক্ষণে তিনি পরিষদের অধিবেশন ডাকছেন।

৭ মার্চ ১৯৭১

সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ লাখো লাখো মানুষের সমাবেশে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, ‘রক্তের দাগ এখনো শুকোয়নি, শহীদদের রক্ত মাড়িয়ে পরিষদে যোগ দিতে যাব না।’

দাবিসমূহ : বক্তৃতায় যেসব দাবি উত্থাপিত হয়েছেÑ

ক. অবিলম্বে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

খ. অবিলম্বে বেসামরিক জনসাধারণের ওপর গুলিবর্ষণ বন্ধ করতে হবে এবং এই মুহূর্ত থেকে যেন একটি বুলেটও ছোড়া না হয়। 

গ. অবিলম্বে সমরসজ্জা বন্ধ করতে হবে এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ব্যাপক হারে  সৈন্য আনা বন্ধ করতে হবে।

ঘ. বাংলাদেশে কার্যরত সরকারের বিভিন্ন শাখার ওপর সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ চলবে না এবং সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ বন্ধ করার নির্দেশ দিতে হবে।

ঙ. একমাত্র পুলিশ ও বাঙালি ইপিআর এবং যেখানে দরকার হয় আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

চ. অবিলম্বে সামরিক আইন  প্রত্যাহার করতে হবে।

ছ. এবং অবিলম্বে জনগণের নির্বাচিত  প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে নির্দেশ ও কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন তার ব্যাখ্যা ও কর্মসূচির বিশ্লেষণ করেন তাজউদ্দীন আহমদ।

ব্যাংক : ১. ব্যাংকের কার্যপরিচালনার জন্য সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকবে এবং  প্রশাসনিক কাজের জন্য তিনটা পর্যন্ত চালু থাকবে।

বাণিজ্যিক ব্যাংক : ২. শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাজ চালানোর সুবিধার জন্য স্টেট ব্যাংক খোলা থাকবে, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়।

বিদ্যুৎ সরবরাহ : ৩. শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ইপিওয়াপদার  প্রয়োজনীয় দপ্তরগুলো খোলা থাকবে।

ইপিএডিসি চালু রাখা : ৪. শুধু সার ও শক্তিচালিত পাম্পগুলোর ডিজেল সরবরাহের নিশ্চয়তার জন্য ইপিএডিসি চালু রাখা হবে।

কয়লা, বীজ সরবরাহ : ৫. ব্রিকফিল্ডের জন্য কয়লা, পাটবীজ ও ধানবীজ সরবরাহের ব্যবস্থা চালু থাকবে।

খাদ্য আনা-নেয়ার কাজ : ৬. খাদ্য আনা-নেয়ার কাজ অব্যাহত রাখা হবে।

ট্রেজারি, এজি : ৭. উপরে উল্লেখিত যে কোনো উদ্দেশ্যে চালান পাস করার জন্য ট্রেজারি ও এজি অফিস খোলা রাখা হবে।

দুর্গতদের সাহায্য চালিয়ে যাওয়া : ৮. ঘূর্ণিদুর্গত এলাকাসমূহে সাহায্য, পুনর্বাসন কাজ অব্যাহত থাকবে।

পোস্ট অফিস খোলা রাখা : ৯. চিঠিপত্র, টেলিগ্রাম ও বাংলাদেশের যে কোনো স্থানে টাকা-পয়সা পাঠানোর জন্য পোস্ট ও টেলিগ্রাম অফিস খোলা রাখা হবে।

ইপিআরটিসি চালু রাখা : ১০. বাংলাদেশের সর্বত্র ইপিআরটিসি কাজ চালু থাকবে।

পানি-গ্যাস সরবরাহ : ১১. পানি ও গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখা হবে।

নিষ্কাশন চালু রাখা : ১২. স্বাস্থ্য ও নিষ্কাশন কাজ চলবে।

পুলিশের কর্তব্য পালন : ১৩. শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ব্যাপারে পুলিশ তাদের কর্তব্য পালন করে যাবে।

১০ মার্চ ১৯৭১

১১৪নং সামরিক আদেশ

‘যে বা যারা  প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সরকারি সম্পত্তি বিনষ্ট করে সেনাবাহিনীর  প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টির জন্য রাস্তা, রেলপথ, নদীপথে যাতায়াত, বিদ্যুৎ কিংবা পানি সরবরাহ বন্ধের চেষ্টা করে যার ফলে সেনাবাহিনীর লোকদের অসুবিধা হতে পারে তবে তাদের এই ধরনের আক্রমণাত্মক কাজের জন্য সামরিক বিধি অনুসারে শাস্তি দেয়া হবে।’

সর্বশেষ খবর

শঙ্খচিল এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by