logo

শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ . ১৪ ফাল্গুন ১৪২২ . ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৭

দেশ ভাগই পরবর্তীকালের যাবতীয় সন্ত্রাস ঘটিয়েছে
২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬
হাসান আজিজুল হক
বাংলা সাহিত্যে হাসান আজিজুল হক বিশিষ্ট নাম। প্রায় ছয় দশক ধরে তিনি নিরবচ্ছিন্ন লিখে যাচ্ছেন। গল্প, প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও উপন্যাসে ব্রাত্যজন, প্রান্তিকজনের জীবন, কৃষ্টি ও সংগ্রাম তুলে এনেছেন বলিষ্ঠভাবে। মুক্তিযুদ্ধ ও দেশ ভাগ তার সাহিত্যের অন্যতম বিষয়বস্তু। গল্পের নিজস্ব ভাষা, উপস্থাপন ভঙ্গিমা, জীবন দেখা ও দেখানোর জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ছোটগল্পই তার কাজের প্রধান অঞ্চল। এ জন্য কখনো কখনো তাকে ‘ছোটগল্পের রাজপুত্তুর’ বলা হয়। অনেক পরে হলেও দীর্ঘদিনের ছোটগল্পের চরাচর তিনি মিশিয়েছেন পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের বিশাল প্রান্তরে। ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসে তিনি ঔপন্যাসিকের শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ অধ্যাপনা করেছেন দর্শন বিভাগে। তার সাহিত্যে তাই দর্শনের উন্মিলন দেখা যায়। আজ এই জীবনঘনিষ্ঠ কথাসাহিত্যিকের জন্মদিন। তার সঙ্গে টেলিফোনে এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তরুণ গল্পকার অলাত এহসান

হাসান আজিজুল হক : হ্যাঁ, মুক্তিযুদ্ধকে আমরা পরবর্তীকালে মনে-প্রাণে গ্রহণ কি করেছি? কী কারণে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? বাঙালি সত্তা। বাঙালিদের একটা আলাদা স্টেট হবে, তাই না? তারপর মুসলমান পরিচয় পরবর্তী পরিচয়, সম্প্রদায়ের পরিচয়, সেটা নিয়ে রাষ্টে"র কিছু করার থাকবে না। রাষ্ট" হবে বাঙালিদের একটা রাষ্ট"। পৃথিবীতে একটা গৌরব যে, তার নিজের ভাষাটাই সেই জাতির নাম, তাই না? তো আমাদের সেটা ছিল। এ রকম কি বোধ আমাদের লেখকদের সঙ্গে কথা বলে, আমাদের ইন্টিলেকচুয়ালদের সঙ্গে কথা বলে সেই বোধটা পাওয়া যায় না। সবাই একটা ধরতাই বুলি বলে খুব মুক্তিযুদ্ধ চালায়। কিš' এই ধরতাই বুলি দিয়ে তো আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু লেখা যাবে না। আমার সংশয়টা সেখানেই। দুই পাহাড়ের খাদে পড়ে গেলে যা হয়।

অলাত এহসান : নাটকে কি উল্লেখযোগ্য কাজ আছে কিনা? সেলিম আল দীন স্যারের মতো নাট্যকার ছিলেন। তো, নাটক কি মুক্তিযুদ্ধকে ধরতে পেরেছিল, আপনি কী বলবেন?

হাসান আজিজুল হক : নাটকে আমার মনে হয় না খুব বেশি ধরতে পেরেছিল। নাটক এমন মিশ্র মাধ্যম, এটা মঞ্চস্থ হয়, এটা কেউ পাঠ করে না। নাটকে যেটা মঞ্চস্থ' হয় সেটার নাম হচ্ছে স্ক্রিপ্ট, সেটাকে উপন্যাস বা গল্প বলে না। তো নাটকে যেটা এসেছে স্ক্রিপ্ট হিসেবে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’তে কবিতার মতো করে বলা যায়, গাওয়া যায়, মানে গীতিনাট্য। হয়েছিল এক রকম ভালই, কিš' জানি না, নাটক বলতে আমি যেটা বুঝি, আমাদের হেনরিক ইবসেন বা এ রকম বড় বড় নাট্যকার যারা আছেন সেরকম নাট্যকার তো আমি...। আর সেলিম আল দীন নানা রকমের এক্সপেরিমেন্ট করেছিল, কিš' মুক্তিযুদ্ধের ওপর আলাদা ইনফ্যাসিস দিয়ে খুব বেশি কিছু সে করেনি আর কি।

অলাত এহসান : কবিতা দিয়েও কি আমরা মুক্তিযুদ্ধকে উপস্থাপন করতে পেরেছি, আপনার কী মনে হয়?

হাসান আজিজুল হক : কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ? আমাকে চেপে ধরে প্রশ্ন করলে আমি তো বাজে কথা বলতে পারবো না।

অলাত এহসান : না, সেটা নয় নিশ্চয়ই। আসলে আপনি স্যার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন, মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই লিখছেন। এখনো লিখছেন। আপনার দেখা সেই পঠন-পাঠনের ভেতর দিয়ে আপনি যা দেখেছেন তা-ই জানতে চা"িছ।

হাসান আজিজুল হক : আ... মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উল্লেখযোগ্য কবিতা আছে কিš' তার সংখ্যা এবং পরিমাণ কম। সংখ্যাও কম, পরিমাণও কম।

অলাত এহসান : আমাদের দেশের সাহিত্যের কিš' একটা বিশেষ দিক ছিল- যারা মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব থেকেই লিখছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং যুদ্ধোত্তর সময়ে এসেও সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এরপরও কেন আমাদের ভাবতে হ"েছ কোনো মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে বা এসেছে কি না? উপন্যাসের জন্য না হয় আমরা আরো কিছু সময় ছেড়ে দিচ্ছি, কি' গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-গবেষণায় কিš' মুক্তিযুদ্ধকে আরো বেশি পেতে পারতাম।

হাসান আজিজুল হক : বটেই তো, কি' সেটা হয়নি। তার দুটো কারণ হতে পারে-মুক্তিযুদ্ধের ইমপ্যাক্ট। যেমন- সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার, ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ার, সিভিল ওয়ার ইন স্পেন, লাতিন আমেরিকায় স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তির জন্য এক-একটা লড়াই, তারপর বিশাল উপনিবেশকে উৎখাত করে স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ এইসব দিকগুলো। এইসব বলে আমাদের লাভ নেই, এইসবের তুলনায় আমরা পরিধিতে খাট। কাজেই এই পরিধির মধ্যে জানি না মহাকাব্যিক বিশাল কিছু রচনা হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, সেটা নিয়ে আরো ভাবতে হবে। আর স্বপ্ন দেখেই যে উপন্যাস রচনা করা যাবে, তা না। আবার যতই দূরে চলে যাবে ততই তলস্তয়ের মতো লোক তো আর বেশি পাওয়া যাবে না- ফিকে হয়ে যাবে বলে একটা আশঙ্কা হয়। পরবর্তীকালে হবে কি না জানি না, যাকে বলা যায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাবো, এটা হয়ে যেতে পারে আর কি।

অলাত এহসান : এটা কিš' স্যার আমার মনে হয় মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে যে অবস্থা- বাস্তবতা তৈরি হল, তাতে করে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত বেশি কাজ করার উৎসাহটা আমরা হারিয়ে ফেললাম।

হাসান আজিজুল হক : কেন যে হারিয়ে ফেললাম জানি না। তুমি কি আমার ‘বিধবাদের কথা’টা পড়েছো?

অলাত এহ্সান : না। আমি সম্প্রতি পড়ছি আপনার প্রথম উপন্যাস ‘শামুক’।

হাসান আজিজুল হক : ওতো সতের বছর বয়সের, ওতো বালকের লেখা। তবে আমি যেটা করি, পার্টিশন নিয়ে আমার খুব বেশি লেখা আছে। ‘আগুনপাখি’ তো পার্টিশনের ওপরই লেখা। দেশ ভাগের বিরোধিতা আমি বরাবরই করে এসেছি, এখনো করি। এবং ওই দেশ ভাগই পরবর্তীকালের যাবতীয় সন্ত্রাসগুলো ঘটিয়েছে। সব দুর্ঘটনা-অন্যায়ের কারণ হয়েছে। সেইজন্য সবই এমন হালকা হয়েছে এখন। আর এখন রাষ্ট" এমন হয়ে গেছে যে, একটা শক্ত অব¯'ান তো থাকবে, সেই অব¯'ানটাও নেই। যেমন বাংলা ভাষা। আ"ছা, এটা তো বাঙালিদের একমাত্র রাষ্ট্র। সবারই ভাষা বাংলা। কাজেই পাকিস্তান থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা নেয়ার পরেও বাংলাদেশের প্রায় বিরানব্বই ভাগ কিংবা আরো বেশি, পঁচানব্বই ভাগ মানুষের ভাষাই বাংলা, তাই না। তাহলে বাংলা ভাষায় জোরটা সর্বো"চ দেয়ার কথা, সেটা কিš' নাই। আমাদের রাষ্টে"র মধ্যে নাই, আমাদের বইপত্রের মধ্যে নাই, উ"চস্তরের সামাজিকতার মধ্যে নাই। আমাদের এখনো পর্যন্ত স্টাইল-টাইলগুলো ঠিক নেই। কাজে কাজেই আমাদের যেটাকে এলিট কালচার বলে সেটা এখনো ইংরেজিয়ানাতে ভরপুর। আমি কোনো দিন যাই না, তবু আমাকে জোর করে সোনারগাঁ হোটেলে নিয়ে গিয়েছিল একবার। এই এবারে একটা বক্তৃতা করতে গিয়েছিলাম। গিয়ে এত বিরক্ত বোধ করেছি যে, বেয়ারাগুলোও ইংলিশে কথা বলে আর কি, আর আমি তো জাতচাষা, কাজেই আমি তাদেরকে বলি যে, ‘কান্ট স্পিক ইন বেঙ্গলি ইন ইওর লেঙ্গুয়েজ? ডু ইউ নো দ্যাট? তোমার মায়ের কাছে কি ভাষা শিখেছো?’ তারা বলে, ‘স্যার এখানে বাইরের লোক বেশি আসে...।’

বাইরের লোক আসে তো বাংলায় কথা বল। ফরাসি দেশে গেলে বাইরের লোক বলে ইংরেজি বলবে না, স্প্যানিশ বলবে না, কি"ছু বলবে না, ফরাসিতে কথা বলবে। ফ"াঙ্কফুটে গিয়ে নামলাম ‘আই ইংলিশ জিরো’ বললো একজন জার্মান। আমি যেই তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আই ডোন্ট স্পিক ইংলিশ’ সে সোজা বলে দিল। এখন ব্যাপার হচ্ছে যে, আমি ইংরেজি ভাষা শিখেছি। যেহেতু উপনিবেশের সময় আমার জন্ম। কাজেই শিখতে হয়, শিখেছি। লিখতে-টিখতে দিলে পারবো। ইংরেজি মাধ্যমে যেহেতু গোটা প"থিবীকে পাচ্ছি, কাজেই ইংরেজি না শিখে আমাদের চলছে না। অশিতি হয়ে থাকতে হচ্ছে। শিতি হতে গেলে ইংরেজিটা আমাদের পড়তে হচ্ছে। সেই দিক থেকে ইংরেজি আমার অত্যন্ত প্রিয় ভাষা। কি' আমি কৃতদাস হিসেবে তো আর ইংরেজি বলবো না। আমি তো ইংরেজি ভাষার দাসত্ব করবো না। আমি ভুল ইংরেজি লিখলে লিখবো, তাতে কি হবে?

অলাত এহসান : হ্যাঁ, আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকগণ একে বলছেন ভাষায় অংশগ্রহণের অধিকার। যেমন- নাইজেরিয়ার লেখক আমোস টুটুওলা লিখেছেন। জেমস জয়েস আঞ্চলিক ইংরেজিই তুলে এনেছেন লেখায়।

হাসান আজিজুল হক : হ্যাঁ, ভুল ইংরেজি লিখলে লিখব। আমি বরং সঠিক বাংলা লিখতে পারি কি-না, সেটাই ‘মাস্ট বি ইওর টেস্ট’।

অলাত এহ্সান : গত নভেম্বরে ঢাকা লিট ফেস্টে যখন আপনি এলেন, তখন একটা প্রশ্ন আমার খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল যে, বাঙালি যারা ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চা করছে তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ কতটা কাজ করছে, এ নিয়ে আপনি কি ভাবেন?

হাসান আজিজুল হক : আমার মনে হয় যে, ওখানে কোনো কমিটমেন্ট বা কোনো বাঁধাধরা বা বাধ্যতা কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। এদের মধ্যে ইংরেজিয়ানাই বেশি। দেশ-সমাজ-বাংলাদেশ-বাংলা ভাষা এসব নিয়ে এদের আগ্রহ অনেক কম। আমি এরপর থেকে আর ওই ফেস্টিভ্যালে যাচ্ছি না।

অলাত এহসান : অনেক লেখককে প্রতিদিন দেখলেও আপনাকে মাত্র একদিন দেখেছি। এটার কি কারণ?

হাসান আজিজুল হক : হ্যাঁ, আমি বলে এসেছি যে, আমি নিজে বাংলায় কথা বলবো, যারা বুঝতে পারে পারবে। না পারলে পাশের একজনকে বলবে যে, ভাই একটু ইংরেজি করে বুঝিয়ে দাও। কিংবা আমাকেও যদি বলে যে, বাংলায় বলে আমি ইংরেজিতে বুঝিয়ে দিব পরে। তো এই সমস্ত কিছু অসত্য আমরা সবসময় করে যা"িছ। জাতি হিসেবে আমাদের সত্যিকারের আত্মসম্মানটুকু হলো না, বাঙালি হিসেবে আত্মসম্মান বোধ জাগলো না।

অলাত এহসান : যারা ইংরেজিতে লিখছে, তারা তো বাঙালি হিসেবেই লিখছে। বিশ্ব বাংলা সাহিত্যের ইংরেজি প্রতিনিধি হিসেবে তাদেরকেই দেখছে। এভাবে তাদের উপ¯ি'তি ঘটছে। আবার আমাদের বাংলা সাহিত্যের যথাযথ অনুবাদও হ"েছ না, তাই না?

হাসান আজিজুল হক : না, তা হ"েছ না। হওয়া উচিত ছিল। এখন দেখা যাক ওরা যদি কিছু করেটরে, এরই মধ্যে ওরা করছেটরছে দু-চারটে, ওই যে ‘বেঙ্গল লাইটস’ (ম্যাগাজিন) করার চেষ্টা করছে। ওরা যদি একটা সেন্টারমেন্টার করে তাহলে হয়তো হবে।

সর্বশেষ খবর

শঙ্খচিল এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by