logo

শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০১৫ . ৬ চৈত্র ১৪২১ . ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

সাব্বিরের অনলাইন মুক্তিযুদ্ধ
২০ মার্চ, ২০১৫
নাদিম মজিদ


জানার জগত হিসেবে অনলাইন এখন বেশ দাপটেই আছে। মানুষ এখন কিছু জানার জন্য বইপুস্তক বা কোনো ব্যক্তির দ্বারস্থ হওয়ার চেয়ে অনলাইনে যেতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধও তাই। বই কিংবা ভিডিওচিত্রের পাশাপাশি এখন অনলাইনও দখল করতে শুরু করেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়। অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ,ভিডিও,স্থিরচিত্র বিষয়ক একটি পাঠাগারের কথা জানাবো আজ। পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা চট্টগ্রামের তরুণ সাব্বির হুসাইন। স্মৃতিমুক্তিযুদ্ধ আর দশজনের মত সাব্বিরেরও ভাললাগার জায়গা। প্রেরণার আরাধ্যস্থল। আপন চাচা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। পারিবারিক অনুপ্রেরণা ছিল সাব্বিরের। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র।  নেমে পড়েন অনলাইন সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করার কাজে। ২০১৩ সালের ৪ মে চালু করেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা বিষয়ক ওয়েবসাইট  www.liberationwarbangladesh.org  । একে একে এ ওয়েবসাইটে যুক্ত করতে থাকেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বই এবং তথ্যসামগ্রী। সাব্বির জানান, ‘ তরুণপ্রজন্মের মাঝে অনেক ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ অনেক সময় তাদের মাঝে সঠিকভাবে ফুটে উঠে না। অনলাইনে স্বাধীনতাবিরোধীরা দেশবিদেশে বসে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এবং তথ্য সমৃদ্ধ করার কাজ করছিল। তরুণপ্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানোর জন্য উদ্যোগ হাতে নিয়েছিলাম।’ কাজটি সহজ ছিল না। একটি বই পেলে সে বই স্ক্যান করতে হয়। কম্পিউটারে সেইভ করতে হয়। তারপর এটি যথাযথভাবে অনলাইনে আপলোড করতে হয়। এটি বেশ সময়সাপেক্ষ কাজ। তারুণ্য আর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে সেই কাজটি সহজ করে দেয়। গবেষক, লেখকদের সহযোগিতা চাইতেই তারাও এগিয়ে আসেন। কেউ বই কিংবা তথ্যচিত্র বিনামূল্যে দেন। কিছু আবার তিনি নিজেও কিনে নেন। বর্তমানে এ ওয়েবসাইটে ৩০০টির বেশি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই এবং ৪০টি ডকুমেন্টারি ফিল্ম রয়েছে। এ কাজে তার ভালবাসা কেমন তা জানার জন্য একটি বই সম্পর্কে তথ্য বলা যেতে পারে। ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র’ বইটি সাড়ে ১১ হাজার পৃষ্ঠার বেশি। পুরো বইটি স্ক্যান করে অনলাইনে আপলোড করা হয়েছে। এছাড়া আরেকটি বই হল ভারত সরকার কর্তৃক লেখা ‘বাংলাদেশ ডকুমেন্টা’। এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ৭ হাজারের বেশি। পাঠকের সুবিধার্থে পুরো বইিট আপলোড করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিভিন্ন বিভাগভিত্তিক তথ্য জমা আছে এখানে। ভাষা আন্দোলন, ছয়দফা, গণঅভ্যূত্থান, স্বাধীনতার ঘোষণা, যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বীরশ্রেষ্ঠ, মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র, মুক্তিযুদ্ধে নারী ও শিশু কিশোর, উদ্বাস্তু শিবিরে বাঙালি, শিল্পে সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ, মৌলবাদের রাজনীতি, সংখ্যালঘু নির্যাতন, রাজনীতি, জাতীয় প্রতীক, বঙ্গবন্ধু, অপপ্রচার, অপপ্রচারের জবাব, পাকিস্তানীদের ভাষ্য প্রভৃতি বিভাগে অনলাইন আর্কাইভটি সাজানো হয়েছে। বিদেশিদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানার সুবিধার্থে রয়েছে ওয়েবসাইটটির ইংরেজি ভার্সন। ওয়েবসাইটটি চালু করার পর থেকে পাঠকের সাড়া  পাওয়া যাচ্ছে। এ পর্যন্ত তার ওয়েবসাইট ভিজিট করেছেন প্রায় ১ লাখ পাঠক। এখানে ভিজিট করা প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাচ্ছেন। তাদের বিভ্রান্ত হওয়ার অবকাশ কম। ওয়েবসাইটটি পরিচালিত হচ্ছে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র’ নামে সংগঠনের মাধ্যমে। এ সংগঠনের অন্য দুটো কর্মসূচি হল পাঠাগার এবং মুক্তিযুদ্ধ পাঠশালা। সাব্বিরের অনলাইন মুক্তিযুদ্ধ

ওয়েবসাইটটি চালু করার কারণ সম্পর্কে সাব্বির জানান, ‘ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার অপচেষ্টাকে ব্যর্থ করা, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস চর্চা করা।’ পাঠকরা বিনামূল্যে এ ওয়েবসাইট ব্যবহার করে আসছে। নিজের জন্য প্রয়োজনীয় যে কোনো বই এখান থেকে ডাউনলোড করছে। কাজটি করতে গিয়ে কিছু ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পেয়েছেন। সাব্বির জানান, ‘ শ্রদ্ধেয় মাহবুবুর রহমান জালাল, মাশুকুর রহমান, দেশের বই ব্লগস্পট ডট কম, আমার বই ডট কম, আমার ব্লগের ইবুক সংগ্রহ, গ্রন্থ ডট কম, সেরা বই ডট কম, জন্মযুদ্ধ, বাংলা গ্যালারী ডট কম, (ICSF) ওয়েবসাইট, সুমন মাহমুদ, জাতীয় গণগ্রন্থাগারের ডিজিটাল আর্কাইভ, সেন্টার ফর বাংলাদেশ জেনোসাইড রিসার্চ (CBGR) সহ অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিভিন্ন বই-দলিল-ডকুমেন্টারী-ভিডিও-অডিও-মুভি-ছবি ও কনটেন্ট আপলোড করেছেন, এমন সকল “ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের” প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।’ তার টিম মুক্তিযুদ্ধ দলে কাজ করছেন এম.আই. খান এবং শিহাব খান। মাত্র তিন ব্যক্তির উদ্যোম এবং চেষ্টায়  প্রচুর দলিল দস্তাবেজে অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধের বিরাট তথ্যভান্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিজের ঘরে বসে এবং নিজের পকেটের পয়সা ব্যয় করে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন সাব্বির হুসাইন। একেবারে নিভৃতে কাজ করছেন তিনি। আনুষ্ঠানিকতার বাহুল্য নেই। সাধারণত কিছু করার সময় মানুষ যেমন উদ্বোধনি অনুষ্ঠান করে কিংবা প্রচার ব্যবস্থা করে সেটাও তিনি করেননি। সরাসরি অনলাইনে গিয়ে পাঠক চাহিদা পূরণ করতে এগিয়ে এসেছেন। বিশাল পাঠকসংখ্যা, বিশাল সংগ্রহ এবং প্রজন্মান্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই তার লক্ষ্য অর্জন হবে। তার ধারণা- অনলাইন সেবা মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানকারী কিংবা বিদেশি পাঠকদেরও সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। বিদেশে অবস্থানকারী বাঙাি নতুন প্রজন্মও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সহজে জানার সুযোগ পাবে। লেখক প্রকাশক ও গবেষকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।

 


সর্বশেষ খবর

গতি এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by